![]() |
শব্দের অর্থহীন ফাঁদে মোহিত হচ্ছেন কর্মীরা—
আমাদের দেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে এ ধরনের ‘ভারী’ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এখন বেশ পরিচিত। সাধারণ কর্মীরা এই শব্দগুলোকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন ও চমকপ্রদ সত্য। মনোবিজ্ঞান সাময়িকী ‘পার্সোনালিটি অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, চটকদার ভাষা বা ‘বুলি’ শুনে যাঁরা বেশি অভিভূত হন, তাঁরা বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে দুর্বল থাকেন। শুধু তা–ই নয়, এ ধরনের গালভরা বুলির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কোম্পানিতে অযোগ্য নেতৃত্ব তৈরির পথও প্রশস্ত করে।
![]() |
মূলত ফাঁপা বুলি...কাজের কাজ কিছুই হয় না—
গবেষকেরা বলছেন, এ ধরনের গালভরা বুলি বা ‘করপোরেট বুলশিট’ হলো এমন কিছু জটিল শব্দের ব্যবহার, যা শুনতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবে তা প্রায় অর্থহীন। গবেষণার লেখক এবং কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট শেন লিট্রেল মনে করেন, যখন কোনো নির্দিষ্ট অর্থ ছাড়াই কেবল অন্যকে মুগ্ধ করার উদ্দেশ্যে এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়, তখনই সমস্যা শুরু হয়। যাঁরা এই ফাঁপা বুলি এবং কাজের কথার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে খুবই সীমিত।
গবেষণার জন্য লিট্রেল একটি বিশেষ জেনারেটর তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে তিনি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ কিন্তু গন্তব্যহীন কিছু বাক্য তৈরি করেন। সেগুলো বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির কর্মকর্তাদের দেওয়া কিছু প্রকৃত উক্তির সঙ্গে মিশিয়ে এক হাজার কর্মীর সামনে রাখা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা এই অর্থহীন শব্দগুলোতে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন, তাঁদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিফলন অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক কম। সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, যাঁরা এই ফাঁপা বুলিগুলোতে বেশি মজে থাকেন, তাঁরাই কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে ভুল এবং অকেজো সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও বেশি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এখানে অনেক সময় দেখা যায়, ইন্টারভিউ বোর্ডে বা মিটিংয়ে যাঁরা চটকদার ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পারেন, তাঁদেরই বেশি ‘স্মার্ট’ বা যোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। বিপরীতে, যাঁরা সহজ ভাষায় আসল কাজের কথা বলেন, তাঁরা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যান। এই প্রবণতার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে, যাঁরা দারুণ সব কথা বলতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে সংকটের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খান। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কোম্পানিগুলো অকার্যকর নেতৃত্বের বৃত্তে আটকা পড়ছে।
তবে সব নেতিবাচক দিকের মধ্যেও এই গালভরা বুলির একটি মোহময়ী গুণ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। যেসব কর্মী এ ধরনের চটকদার শব্দে মুগ্ধ হন, তাঁরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও দূরদর্শী বলে মনে করেন। কোম্পানির চটকদার লক্ষ্য বা স্লোগান তাঁদের সাময়িকভাবে অনুপ্রাণিতও করে। অর্থাৎ, এই বুলি কর্মীদের মোহগ্রস্ত করে রাখার ক্ষেত্রে বা অফিসের পরিবেশ কৃত্রিমভাবে উজ্জ্বল রাখার ক্ষেত্রে কাজ দিলেও প্রকৃত প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়নের পথে এটি এক বড় বাধা।
মজার ব্যাপার হলো, উচ্চশিক্ষা বা বড় ডিগ্রিও এই ফাঁপা বুলির জাদু থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, পিএইচডিধারী ব্যক্তিরাও অনেক সময় এই শব্দের জাদুতে বিভ্রান্ত হন। শেন লিট্রেল মনে করেন, এটি কেবল কম বুদ্ধিমান মানুষের সমস্যা নয়। পরিস্থিতি এবং নিজের আগে থেকে থাকা কোনো বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে গেলে যে কেউ এই ফাঁদে পা দিতে পারেন।
গবেষকেরা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে করপোরেট–জগতের কর্মকর্তাদের উচিত চটকদার শব্দের বদলে কাজের স্বচ্ছতা এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর জোর দেওয়া। একজন প্রকৃত যোগ্য নেতার পরিচয় তিনি কত বড় বড় শব্দ ব্যবহার করছেন তার ওপরে নয়, বরং তিনি কত সহজে এবং সঠিকভাবে সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে। তাই পরবর্তী মিটিংয়ে কেউ যখন বিশাল কোনো গালভরা বুলি ছাড়বেন, তখন মুগ্ধ হওয়ার আগে একটু ভাবুন—এই সুন্দর শব্দগুলোর আড়ালে আসলে কোনো কাজের কথা আছে তো?


Post a Comment