![]() |
এস. এম আবু রায়হান : সাধারণত যুদ্ধে যারা লিপ্ত থাকে, তাদের মধ্যেই থাকে জয়ের বা পরাজয়ের হিসাব। যারা অংশ নেয় না গোলাগুলি করে না, মিসাইল ছুঁড়ে না তাদের কাছে জয়ের বা হারের কোনো স্থান থাকে না। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এক আলাদা ছবি। এই যুদ্ধে কোনো দেশই সত্যিকারের জয়ী নয়, আর কোনো দেশের মানুষই নিরাপদ নয়। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত, সবাই হারছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যাদের হাতে যুদ্ধের সূচনা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভাবেছিল, পরিস্থিতি দুই দিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝিয়েছিলেন, যদি খামেনিকে হত্যা করা যায়, ইরানিরা সরব হয়ে সরকারের বিপরীতে রাস্তায় নামবে, আর শাহের ছেলে রেজা পাহলভি সরকার গঠন করবেন। অল্প সময়ে জয় হবে এমনটা প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা।
কার্টুনিস্ট ইলা ব্যারন গার্ডিয়ান পত্রিকায় ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ শিরোনামে এক চিত্র আঁকেছেন। সেখানে ট্রাম্পকে উলঙ্গ অবস্থায়, এক মিসাইল দিয়ে লজ্জা ঢেকে এগোতে দেখা যাচ্ছে, আর নেতানিয়াহু তাকে পথ দেখাচ্ছেন। একটিমাত্র কার্টুন এত কিছু প্রকাশ করেছে, যা হাজার শব্দেও বোঝানো যেত না।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও, যাদের কাছে রয়েছে নানা ধরনের আধুনিক অস্ত্র, এক মাসের মধ্যেই তাদের অবস্থার অসহায়ত্ব এবং সীমাবদ্ধতা বেরিয়ে এসেছে। এই অবস্থা ইলা ব্যারনের কার্টুনে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সস্তা ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল টমাহক মিসাইলের বড় অংশ শেষ করে দিয়েছেন। একটি টমাহক মিসাইলের দাম প্রায় ২.৬ থেকে ৩.৬ মিলিয়ন ডলার, এবং সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর মাত্র ৯০টি মিসাইল তৈরি করে। এখন পেন্টাগন ইউক্রেনে পাঠানো অস্ত্র সরবরাহ করে এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে।
মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো যুদ্ধের খোঁজখবর রাখেন না, কিন্তু খরচের খোঁজ অবশ্যই রাখতে হয়। শিল্পোন্নত এই দেশে প্রচুর জিনিস উৎপাদনের জন্য বিশাল পরিমাণ জ্বালানি তেলের ব্যয় হয়, যা নাগরিকদের পকেটের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
![]() |
গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে প্রচার ছিল অনেক, কিন্তু বাস্তবে মাত্র ১.৪ শতাংশ গাড়ি বিদ্যুৎচালিত। এর মধ্যে, গ্যাস স্টেশনে তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে, ক্যালিফোর্নিয়াতে আরও বেশি। সাধারণ মানুষ যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি অনুভব করছে। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘ইরানের যুদ্ধের পরিধি বাড়ছে, যার ফলে পেট্রলের দাম ইতিমধ্যেই আমেরিকান ভোক্তাদেরকে প্রভাবিত করছে। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও একই পথে বাড়তে পারে।’
মুদ্রাস্ফীতি ও ধীর গতির চাকরির বাজার ইতিমধ্যেই ভোক্তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ নতুন আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি আজই সংঘাত শেষ হয়, তবু এর অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় আছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের মধ্যে টেনে এনেছেন। এখন জনমত অনেকাংশে নেতানিয়াহুর প্রতি বিরূপ। ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বরাও এখন ইসরায়েল সমালোচক। টকার কার্লসন ও মেগ্যান কেলি ফক্স নিউজের সাবেক হোস্ট—উভয়ই এখন জনপ্রিয় টক শোতে তুমুল সমালোচনা করছেন।
যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ক্ষতি ইসরায়েলের হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেন। কারণ ট্রাম্প কখনও হারের পাশে থাকতে পছন্দ করেন না, এবং যারা তাকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে তাদের শাস্তি দিয়ে তিনি নিজের প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধার করতে চাইবেন।
ইসরায়েলও ইরানের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। সেনাবাহিনী প্রধান সতর্ক করেছেন, আইডিএফের জনবল সংকট খুবই তীব্র হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘আইডিএফ ধ্বংস হওয়ার আগে আমি ১০ নম্বর লাল সিগন্যাল দিচ্ছি।’
দেশের অস্ত্রভাণ্ডারও সীমারেখার কাছে পৌঁছেছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ইরানের সস্তা ড্রোনগুলো আর প্রতিহত করা হবে না। এর মধ্যে, প্রতিদিন হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক একাধিকবার আশ্রয়শিবিরে দৌড়াচ্ছেন।
যুদ্ধের শেষে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ইসরায়েলের। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেন। কারণ তিনি হারের পাশে থাকতে পছন্দ করেন না এবং যারা তাকে বিভ্রান্ত করেছে, তাদের শাস্তি দিয়ে নিজের প্রতিপত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান।
![]() |
ইউরোপের দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না যুক্ত হওয়ায় ট্রাম্পের ক্ষোভ বিরাট। তিনি ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারময় বলে মন্তব্য করেছেন। ইউরোপের মানুষ জ্বালানি তেলের সংকটের মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় পুরো ইউরোপ রাশিয়ার তেল বর্জন করেছিল এখন তারা কীভাবে টিকে থাকবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
রাশিয়া এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমান প্রতিযোগী ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে আবার দেখা গেল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার প্রভাব কতটা সীমিত। এই যুদ্ধের মধ্যে চীনের অবস্থাও খুব ভালো নয়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে তাদের উন্নয়ন থমকে গেছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যও ঝুঁকির মুখে।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে আছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমান। এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিল, নিজেদের নিরাপত্তার আশ্বাসে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। মার্কিন ঘাঁটির কারণে ইরান এসব দেশে হামলা চালাচ্ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভারতেও পড়ছে। ১৪০ কোটি মানুষের রান্নার জন্য অপরিহার্য এলপিজি’র প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে, যার ফলে ক্যানটিন, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় জ্বালানিসংকট বেড়ে গেছে। অনেক জায়গায় জনপ্রিয় আইটেম শিঙাড়া মেনু থেকে সরানো হয়েছে, এমনকি চায়ের সেই পরিচিত গরম ও সুবাসও কমে গেছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি এখনো আলাদা। সরকারি ভর্তুকির কারণে চা–শিঙারাতে সরাসরি প্রভাব পড়েনি। তবে নতুন সরকার যুদ্ধজনিত জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। হরমুজ প্রণালীর বন্ধ এবং যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে ডিজেল ও পেট্রলের দাম ১০৮ থেকে ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তা সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হয়নি, ফলে ভোক্তাদের ওপর সাময়িক চাপ পড়েনি।
সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ চলছে বাড়ি বাড়ি, দোকান ও গোয়ালঘরে। এতে বিপদের আশঙ্কা তীব্র—যদি কোনো বাড়িতে আগুন লাগে, তা সহজেই পুরো গ্রাম পুড়ে যেতে পারে। ইরান যুদ্ধ দেশের কাছাকাছি সংকট ও ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
বাজারে উৎকণ্ঠা তীব্র রয়েছে। কিছু পেট্রলপাম্পে ক্রেতাদের ৮–১০ ঘণ্টা পর্যন্ত তেলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, “প্রতিদিন সরকার ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে।” এই হারেই ভর্তুকি চলতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অল্প সময়েই শেষ হয়ে যেতে পারে।
এই যুদ্ধে অনেক বাংলাদেশি শ্রমজীবী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের পরিবার ও স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ ও উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘সংঘাত ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ ইরান যুদ্ধের প্রায় এক মাস পরে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, “ইরান ও বৃহত্তর অঞ্চলে যুদ্ধের পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক এবং তা ক্রমশ বাড়ছে। প্রধান হুমকি হলো সংঘাতজনিত দূষণ, যা জনস্বাস্থ্য, স্থলজ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলাধারের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষভাবে ইরানের জলাশয়গুলোর দূষণ উদ্বেগজনক, কারণ দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অপ্রতুল ব্যবস্থাপনার কারণে পানির উৎসগুলো ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন।”
ইরানের পরিস্থিতি মারাত্মক। এক দেশের ওপর দুই শক্তিশালী দেশের আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার দীর্ঘদিন চললে ধ্বংসযজ্ঞ কল্পনাযোগ্য। ইরান ইতিমধ্যেই অন্তত ১২ জন শীর্ষ নেতা হারিয়েছে, দুই হাজারের মতো সাধারণ মানুষ মারা গেছে। তবু দেশটি সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ান লিখেছেন, “ইরানে কিছুই স্বাভাবিক নেই।” তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “আমরা কতদিন লড়ব? চিরকাল? ইসরায়েলের ধ্বংস ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার পর্যন্ত? ইরানের ধ্বংস বা আত্মসমর্পণ পর্যন্ত?”
কারও কাছে কি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর আছে? যাই হোক, যুদ্ধ শেষে কোনো প্রকৃত জয়ী পাওয়া যাবে না। এজন্যই নোবেল বিজয়ী মনীষী বার্নার্ড শ বলেছেন, যুদ্ধ শুধু ঠিক করে কে অবশিষ্ট থাকবে।
এস.এম. আবু রায়হান, সাংবাদিক ও জিএম টেলিভিশনের চেয়ারম্যান



Post a Comment