Top News

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির যে ধারা টেলিযোগাযোগ খাতে তুলেছে আলোচনা

 

প্রতীকী ছবিএআই দিয়ে তৈরি

মোবাইল, ওয়াই-ফাইসহ সব ধরনের বেতার যোগাযোগে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির ‘স্পেকট্রাম’ ব্যবহার করা হয়। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড সেই স্পেকট্রামের একটি অংশ, যার পরিসর ৫.৯২৫ থেকে ৭.১২৫ গিগাহার্টজ। সহজভাবে বললে, এটি একটি মহাসড়কের মতো, যার মধ্য দিয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট–সেবা দেওয়া হয়।

৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড দুটি অংশে বিভক্ত। এর নিচের স্তরে রয়েছে প্রায় ৫০০ মেগাহার্টজ। বর্তমানে এটি লাইসেন্স ছাড়াই ওয়াই-ফাই ও ঘরোয়া ইন্টারনেট–সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে ওপরের স্তরে প্রায় ৭০০ মেগাহার্টজ রয়েছে, যা মূলত মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার জন্য সংরক্ষিত। সরকারকে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে মোবাইল অপারেটরগুলো এই স্পেকট্রাম নিতে পারে।

চুক্তিতে যা আছে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ডিজিটাল ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজি শাখার ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যচুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে উচ্চগতির বেতার ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রসারে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি বড় অংশ উন্মুক্ত করতে হবে। এতে ৬.৪২৫ থেকে ৭.১২৫ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে থাকা ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবহারের সুযোগ পাবে ওয়াই-ফাইসহ স্বল্প ক্ষমতার ডিভাইসগুলো।

৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের পুরোটা লাইসেন্সবিহীনভাবে ওয়াই-ফাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো। উচ্চগতির ইন্টারনেট সহজলভ্য হলে এই কোম্পানিগুলোর ক্লাউড সেবা, ভিডিও স্ট্রিমিং, অ্যাপ ইকোসিস্টেম এবং স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

টেলিযোগাযোগ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে চুক্তির এ ধারার পেছনে তিন কারণ জানা গেছে।

প্রথমটি হলো, ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের পুরোটা লাইসেন্সবিহীনভাবে ওয়াই-ফাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো। উচ্চগতির ইন্টারনেট সহজলভ্য হলে এই কোম্পানিগুলোর ক্লাউড সেবা, ভিডিও স্ট্রিমিং, অ্যাপ ইকোসিস্টেম এবং স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কারণ, ওয়াই-ফাইভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহারে গ্রাহকের খরচ তুলনামূলক কম।

দ্বিতীয়টি হলো, ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড লাইসেন্সবিহীন হলে সেটি ব্যবহারের জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। এতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কার্যত বিনা খরচে উচ্চগতির নেটওয়ার্ক–সুবিধা ব্যবহার করে তাদের পণ্য ও সেবার বিস্তার ঘটাতে পারবে।

তৃতীয়টি হলো, এই ব্যান্ড উন্মুক্ত হলে নতুন প্রজন্মের ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি (যেমন ওয়াই–ফাই ৬ই, ওয়াই–ফাই ৭) দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এতে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, স্মার্ট হোম ডিভাইসসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়বে, যা সরাসরি এসব কোম্পানির ডিভাইস ও ইকোসিস্টেম ব্যবসাকে শক্তিশালী করবে।

ফাইভ–জি সেবায় প্রভাব

মোবাইল অপারেটর সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের হাতে মোট স্পেকট্রাম রয়েছে প্রায় ৪০০ মেগাহার্টজ। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নত মানের ফাইভ–জি সেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ২ হাজার মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের মোবাইল ডেটার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ ফাইভ–জি, সিক্স–জি সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে, সম্পূর্ণ ৬ গিগাহার্টজ ওয়াই-ফাইয়ের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা মোবাইল নেটওয়ার্কের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
তাইমুর রহমান, চিফ রেগুলেটরি কর্মকর্তা, বাংলালিংক

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) প্রতি চার বছর পরপর ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সের (ডব্লিউআরসি) আয়োজন করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের কনফারেন্সে বাংলাদেশ ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ওপরের অংশকে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার জন্য ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছিল বলে জানিয়েছেন মোবাইল অপারেটররা। ভারত, চীন, মালদ্বীপসহ একাধিক দেশ একই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলেও তাঁরা জানান।

অপারেটরগুলোর শঙ্কা, এই পর্যায়ে বাংলাদেশ অবস্থান পরিবর্তন করলে সীমান্ত এলাকার নেটওয়ার্ক সিগন্যাল বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একটি মোবাইল অপারেটরের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও ওয়াই–ফাই দিয়ে সম্পূর্ণ দেশের নেটওয়ার্ক কভার করা যায় না। ৬ গিগাহার্টজের পুরো ব্যান্ডটি ওয়াই–ফাইয়ের জন্য রেখে দিলে মোবাইল ইন্টারনেটের জন্য স্পেকট্রাম থাকছে না। অথচ ফাইভ–জি, সিক্স–জির মতো সেবার সম্প্রসারণের দিকে যত এগোবে, তত বেশি স্পেকট্রামের চাহিদা বাড়বে। ফলে সামনে যখন স্পেকট্রামের চাহিদা বাড়বে, তখন দেশ পিছিয়ে পড়বে।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একই মত বাংলালিংকের চিফ রেগুলেটরি কর্মকর্তা তাইমুর রহমানেরও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মোবাইল ডেটার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ ফাইভ–জি, সিক্স–জি সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ৬ গিগাহার্টজ ওয়াই-ফাইয়ের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা মোবাইল নেটওয়ার্কের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।’

বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক ১ কোটি ৪৭ লাখের কিছু বেশি। মোবাইল ইন্টারনেটের গ্রাহক ১১ কোটি ৩৫ লাখ। দেশের ব্রডব্যান্ড সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। সেবার মান বাড়াতে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করে দেওয়া নতুন সুযোগ হয়ে আসবে বলে মনে করছে আইএসপিগুলো।

তবে নতুন প্রজন্মের ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি, যেমন ওয়াই-ফাই ৬ ও ওয়াই-ফাই ৭ চালু করতে হলে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোবাইল অপারেটরদের জন্য ৭০০, ৮০০ ও ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্পেকট্রাম খালি রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার না করেই ৬ গিগাহার্টজ নিয়ে উদ্বেগ দেখানো কতটা যৌক্তিক?’

সুযোগ দেখছে আইএসপিগুলো

বিটিআরসির গত ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক ১ কোটি ৪৭ লাখের কিছু বেশি। মোবাইল ইন্টারনেটের গ্রাহক ১১ কোটি ৩৫ লাখ। দেশের ব্রডব্যান্ড সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই।

ব্রডব্যান্ডের প্রসারে এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবার নিশ্চয়তা দিতে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করা একটি বড় সুযোগ হতে পারে। এতে করে গ্রাহকেরা তাঁদের আধুনিক ডিভাইসগুলোর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
রকিবুল হাসান, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা, লিংক থ্রি টেকনোলজিস

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও (আইএসপি) বলছে, বর্তমানে দেশে ওয়াই-ফাই সেবার জন্য ব্যবহৃত ২.৪ ও ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড অত্যন্ত জনাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। সেবার মান বাড়াতে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করে দেওয়া তাই নতুন সুযোগ হয়ে আসবে।

আইএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান লিংক থ্রি টেকনোলজিসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা রকিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ব্রডব্যান্ডের প্রসারে এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবার নিশ্চয়তা দিতে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করা একটি বড় সুযোগ হতে পারে। এতে করে গ্রাহকেরা তাঁদের আধুনিক ডিভাইসগুলোর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

জানতে চাইবে বিটিআরসি

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ চুক্তির আগে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ওপরের স্তর লাইসেন্সবিহীন করে দেওয়া হলে রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, নিজেদের অ্যাসেসমেন্টসহ বিষয়টি নিয়ে সরকারের কাছে জানতে চাইবে বিটিআরসি। সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবে এটি বাস্তবায়িত হবে।

‘চুক্তিতে যেভাবে লিখিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে আইটিইউ পর্যন্ত যেতে হবে। তাদের অনুমোদন নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যদি আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হয়, তাহলে চুক্তি পরিবর্তন করতে হবে,’ বলেন এমদাদ উল বারী।


Post a Comment

Previous Post Next Post